মোহনবাগানে সনি নর্দির অধ্যায় | Mohun Bagan Legends ft. Sony Norde


ঘড়ির কাঁটা ফিরে যায় ২০১৪ সালে। ২০০৯ সুপার কাপ জেতার পর মোহনবাগানে তখন চলছে ট্রফির খরা, দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে ক্লাবের  ইতিহাসে সব থেকে লম্বা সময়, ২০১০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত  ক্লাবে আসেনি কোন জাতীয় ট্রফি। খেলোয়াড় থেকে কর্মকর্তা সবাই তখন সমর্থকদের রোষানলের মুখে। এমন এক কঠিন সময়ে মোহনবাগানের সামনে সুযোগ আসে সেই ট্রফিটি ঘরে তোলার যেটা দিয়ে তাদের যাত্রাপথ শুরু হয়েছিল এক শতাব্দী আগে! আই.এফ.এ শীল্ড। গ্রুপ স্টেজের শেষ ম্যাচে মোহন বাগানের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের দল  ‘শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব’, ম্যাচ ড্র করলে বা জিতলেই মোহনবাগান চলে যাবে সেমিফাইনালে। কিন্তু ওডাফাহীন মোহনবাগান সেই ম্যাচ হেরে গেলো শেখ জামালের কাছে। খলনায়ক এক সোনালী চুলের হাইতিয়ান ফুটবলার। তারই বাঁক খাওয়ানো ফ্রীকিকে নিভে যায় বাগানের শিল্ড জেতার স্বপ্ন।

সোনালী চুলের সেই খলনায়কের খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান বাগান সমর্থক এবং কর্মকর্তারা। শুরু হয়ে এক দীর্ঘ যুদ্ধ। অনেক কাঠ-খড় পোড়ানোর পর ২০১৪-১৫ মরশুমের জন্য সই করানো হল তাকে। কিন্তু কে জানতো যে তাঁর খলনায়ক থেকে নয়নের মনি হওয়ার অধ্যায়টা ইতিহাস হয়ে থেকে যাবে সকল মোহনবাগানীদের হৃদয়ে। কালকের খলনায়ককে ভুলে সমর্থকেরা নতুন আশার আলোয় বুক বাঁধলেন - এক অনতিক্রান্ত পর্বত: আই-লীগ। আর্জেন্টিনার বোকা জুনিয়রস, বাংলাদেশের শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র, শেখ জামাল ঘুরে, ভারতের মাটিতে পা রাখলেন তিনি। শুরু থেকেই  প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশছোঁয়া। ইচ্ছে ছিল বাগানের হয়ে ১০ নম্বর জার্সি পরে খেলার, কিন্তু তা অন্য খেলোয়াড়ের কাছে থাকায় ভাগ্য জুটল ১৬ নম্বর জার্সি, যা পরবর্তীকালে তার নামের সাথে সমার্থক হয়ে যায়।  

পড়শী ক্লাবে তখন সবে শেষ হয়েছে মর্গান রাজ। ২০১০ থেকে টানা ৪ বার কলকাতা ফুটবল লীগ চ্যাম্পিয়ন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল। শেষ ৮ বছরে খান চারেক ফেড কাপ ঘরে তুলে নিয়েছে লাল হলুদ বাহিনী। বাগানের সেখানে ট্রফি বলতে ১টা ফেড কাপ, ১টা সুপার কাপ আর পাতে না দেওয়ার মত এয়ারলাইনস গোল্ড কাপ। এই 

ট্রফির খরা কাটাতে শুরু থেকেই পাখির চোখ করা হয় আই-লীগকে।

Pic Courtesy : arunfoot.com

লীগে ম্যাচের পর ম্যাচ ধারাবাহিকভাবে উপহার দিতে থাকেন নজরকাড়া পারফরম্যান্স। অবলীলায় ৪-৫ জন ডিফেন্ডার কে কাটিয়ে গোল করা বা সতীর্থদের গোল করার জন্য বল সাজিয়ে দেওয়া নজর কাড়ে ভারতের সকল ফুটবলপ্রেমীদের। তাঁর খেলার মধ্যে ছিল আলাদা এক আনন্দ, দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতো তার খেলার দিকে। তাঁর পায়ে বল পেলেই সমর্থকদের মুখে মুখে তার নামের জয়ধ্বনি, তার পায়ে বল মানে সকল মোহন বাগানিরা আশা করত নতুন কিছু দেখার। অসাধারণ ড্রিবলিং স্কিলের সঙ্গে অনবদ্য শট ও সেট-পিস নেওয়ার ক্ষমতা তাকে অনান্য খেলোয়াড়দের থেকে আলাদা করত। 

৩১ শে মে ২০১৫, বেঙ্গলুরুর কান্তিরভা স্টেডিয়াম: লম্বা লীগের শেষ লগ্নে মুখোমুখি বেঙ্গালুরু এবং মোহন বাগান। মোহনবাগানকে লীগ জিততে হলে ম্যাচ না হারলেই চলবে কিন্তু বেঙ্গালুরু কে লীগ জিততে হলে ম্যাচটা জিততেই হবে। কোটি কোটি মোহন জনতার হৃদয়ে সেদিন একটাই চাহিদা, তাদের মুখে একটাই নাম, SN১৬।

আধিপত্য নিয়ে খেলা শুরু করে, জনসনের গোলে বেঙ্গালুরু যখন এগিয়ে গেলো, ভিতর থেকে একটা চাপা কান্না ডুকরে উঠল। হাফ টাইমে মাথা নিচু করে বসে আছি। এক একটা বছর ফ্ল্যাশব্যাক হিসেবে চোখের সামনে থেকে সরে যেতে লাগল। ২০০০, ২০০৫, ২০০৮..না পাওয়া স্মৃতিগুলো মণিকোঠা থেকে ঠেলে বেরিয়ে এল, সাথে একরাশ হতাশা "না, এবারেও হলো না"। তখনো যে কোটি কোটি মোহন জনতার কাছে হাইতির জাদুকর নিজের শ্রেষ্ঠ ম্যাজিকটা প্রকাশ করেনি!

দ্বিতীয়ার্ধে মরিয়া হয়ে ওঠে বাগান। হাইতিয়ান জাদুতে আবার প্রাণ ফিরে পায় সবুজ মেরুন বাহিনী। বৃষ্টিস্নাত কান্তিরাভাতে শুরু হল 'দ্যা লাস্ট অ্যাক্ট'। ম্যাচের বয়স তখন ৮৭ মিনিট। কর্ণার মোহনবাগান। সোনালী চুল ঝাঁকিয়ে যখন ভাসানো বলটা সেন্টার সার্কেলে বেল্লো রাজ্জাক মাথায় ফেললেন, তখন জাদুকর তার অন্তিম ট্রিকে ('প্রেস্টিজ'), পর্যদুস্ত করলেন দেশের এক নম্বর কর্পোরেট ক্লাবের দ্বিতীয়বার ভারতসেরা হওয়ার স্বপ্ন। আর মোহনবাগানীদের স্বপ্ন? সেটি ততক্ষণে ইউনিকর্ন ডানায় ভর দিয়ে অশ্বমেধ ঘোড়া হয়ে ছুটছে। ৫ বছরের ট্রফি না পাওয়ার খেদ, ১৫ বছর জাতীয় লীগ না পাওয়ার খেদ, সবই ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে ৫' ৯ উচ্চতার সোনালী চুলের জাদুকরের হাসিতে। এয়ারপোর্টে লক্ষ লক্ষ মোহন বাগানিদের শব্দব্রহ্ম মাঝে একটা নাম বারবার গর্জে ওঠে। বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেলেন, "এক ছিলেন যীশু, আজ তার নবজন্ম"

নতুন মরসুমে আবার ভারতসেরা হওয়ার লক্ষ্যে। মধ্যমণি ১৬ নম্বর জার্সিধারি। দেশের যে কোনো স্টপারকে অবহেলায় ড্রিবল করে গোল করা বা করানোর নিপুণ দক্ষতা বাগানকে টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত থাকতে সাহায্য করে। তার স্বপ্নের ফর্ম চলতে থাকলেও দলগত ভাবে কিছুটা পিছিয়ে পরে মোহন বাগান। ফলস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জেতা ম্যাচ ড্র  করে ২ পয়ন্টের জন্য লীগ হাতছাড়া। বাগান জেনারেল, সঞ্জয় সেন জানতেন কীভাবে সেই হতাশা অদম্য জেতার ইচ্ছা পরিণত করতে হয়।


২০১৬ ফেডারেশন কাপ। কোয়ার্টার ফাইনাল ফিরতি ম্যাচে বারাসাত স্টেডিয়ামে জ্বলে উঠল বাগানের নয়নমনি। সালগাওকারের বিরুদ্ধে প্রথম গোলটা করালেন জাপানি সতীর্থ, কাটসুমি ইউসাকে দিয়ে। দ্বিতীয় আর তৃতীয় তার পা থেকে। ২ টি গোলই ছিল দৃষ্টিনন্দন এবং একক দক্ষতার পরিচয়। সেমিফাইনালে হাইতিয়ান সুনামিতে খড়কুটো মত উড়ে গেল শিলং লাজং। ৫ গোলের মধ্যে তিনটে তাঁর তৈরি করে দেওয়া। গ্যালারীতে সমর্থকেদের বাঁধ ভাঙ্গার উচ্ছাসের মাঝে ২০ নম্বর বার ফেডারেশন কাপের ফাইনালে উঠলো বাগান।

আই লিগটা হাতছাড়া হয়েছে৷ তাই বলে ফেড কাপও? নৈব নৈব চ! সমর্থকদের আশা ভরসার মান রাখতে হবে তো! আগের মরশুমের ভারতসেরা কোচকে পরের মরশুমেই মানুষ ভুলে যাবেন, সেটাও তো হতে দেওয়া যায় না! এমনটা হতেও দিল না সোনি নর্ডি অ্যান্ড কোম্পানি৷ দুই বাঙালি কোচের মগজাস্ত্রের খেলায় প্রথমার্ধে কেউ কাউকে এক ইঞ্চিও জমি ছেড়ে দেয়নি। বিরতির পরই ছবিটা এক্কেবারে পাল্টে গেল৷ প্রথমার্ধের বাগানের সঙ্গে দ্বিতীয়ার্ধের বাগানের কোনও সামঞ্জস্য নেই৷ হাইতিয়ানের গোল দিয়েই খাতা খুলল গঙ্গাপারের ক্লাব৷ তারপর একের পর এক আক্রমণ আছড়ে পড়ল আইজল শিবিরে৷ জেজে, বিক্রমজিৎদের মুহুর্মুহু হানায় জহর দাসের রক্ষণ তখন নাজেহাল হয়ে পড়েছে৷ হাইতির বাঁশিওয়ালা নেতৃত্বে মোহন বাগান যে ঝড় তুলল, নির্ধারিত সময়ের শেষ পাঁচ মিনিট আগে পর্যন্তও সেই ঝড় থামাতে পারলেন না জহর দাস। ৫ গোলের মালা পরিয়ে ২০০৮-এর পর ফের ভারতসেরার ট্রফি নিয়ে শহরে ফিরল সঞ্জয় সেন বাহিনী। তার বাগানে তখন নানান রকম ফুলের  বাহার, সবচেয়ে উজ্জ্বল এক সোনালী সূর্যমুখী।

ফেডারেশন কাপ ছাড়াও সেই মরসুমের সবচেয়ে বড় চমক ছিল প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ম্যাচ জেতা। পড়শী ক্লাবের এশিয়ান ফর্ম দেখে বরাবর হালকা ঈর্ষা হতো। ২০১৬ ছিল আমাদের প্রমাণ করার পালা। ঘরের মাঠে  তামপাইন রোভার্স এর মতো দলেকে ৯০ মিনিট দৌড় করিয়ে হারানোর নেপথ্যে আবারও সেই সোনালী চুলের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। চ্যাম্পিয়ন্স লীগ থেকে বিদায় নিয়ে, মোহন বাগান সুযোগ পায় এএফসি কাপে খেলার। গ্রুপ পর্যায়ে বাগানের হাল ধরলেন সেই ১৬ নম্বর। মাজিয়া কে হোমে ৫-২ পর্যদুস্ত করার পর চায়নার মাটিতে গিয়ে চায়নার দলকে ৪-০ গোলে দুরমুশ করে আবার ঘরের মাটিতে ইয়ানগ‌ন ইউনাইটেড ৩-২ বধ। তিন ম্যাচে গোল-সহ তার অবদান রয়েছেন সকলের ওপরে। জাপানি সতীর্থ কাটসুমির সাথে জুটি বেঁধে উইং দিয়ে একরে পর এক নিখুঁত বলগুলো রাখলেন জেজে-গ্লেনের উদ্দেশ্য। সাউথ চায়না এফসির বিরুদ্ধে একক দক্ষতায় করা তার গোল টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা নির্বাচিত করা হয়। মাজিয়ার বিরুদ্ধে লজ্জাজনক হারের মাঝে তার করা ফ্রীকিক গোল ভারতের সকল ফুটবলপ্রেমিকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়।

নতুন মরশুম শুরুর আগে বাগান প্রাণভোমরার সই করা নিয়ে বিস্তর ধোঁয়াশা, জলঘোলা। ক্লাবের থেকে প্রত্যেকদিন নতুন খবর আসছে। কেউ বলে সনি আর ফিরছে না তো ওপর পক্ষ বুক ঠুকে বলছে সে আসবেই। অবশেষে সব জল্পনায় জল ঢেলে দিয়ে তিনি থেকে যান সবুজ-মেরুনে। দু দুবার আইএসল প্রলোভন পেয়েও তিনি থেকে যান প্রাণের ক্লাব সবুজ মেরুন ক্লাবে। ইউরোপের ট্রায়াল দিতে যাবেন ভেবেও যাননি। যাবেনই বা কোথায়? তিনি তখন কোটি কোটি মোহন জনতার আশার আলো। যে সমর্থক আর ক্লাব এত ভালোবাসা দিয়েছে, তাদের ছেড়ে তিনি যেতেন কি করে ? গঙ্গাপারের ক্লাবে তিনিই জোয়ান অফ আর্ক, তিনিই গাই ফক্স। 

মেজাজে ফর্ম বজায় রেখে সেই মরশুমে অসম্ভব এক সুন্দর স্মৃতি মোহন জনতাদের উপহার দিলেন। “স্টেন-গান” সেলিব্রেশন। আই লীগে ৭৪৩ দিন ইস্টবেঙ্গল ডার্বিতে অপরাজিত। আগের মরশুমেই মোহনবাগানকে ৪-০ গোলে দুরমুশ করেছে লাল হলুদ বাহিনী। হারতে হারতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বাগানের বদলার বারুদ এল তার পা থেকে। ইস্টবেঙ্গল তাদের শক্ত ঘাঁটি, শিলিগুড়িতে মাথা নোয়াতে বাধ্য হলো “স্টেন-গান” সামনে। ৩৫ মিনিটে বক্সের বাঁ দিক ভাসানো ফ্রি কিক জালে জড়ানোর পর সেই উৎসবের ভঙ্গিমা চিরকাল কলকাতা ডার্বি শব্দটার সাথে সমার্থক শব্দ হয়ে ওঠে। ঘরের মাঠে বেঙ্গালুরুকে দুরমুশ করা হোক বা ইস্টবেঙ্গলকে তাদের মাঠে হারানো, খুব কম খেলোয়াড়ই এমন মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সবুজ-মেরুন জার্সিতে। ১ পয়েন্টের জন্য লীগ হাতছাড়া করার আক্ষেপ গুছিয়ে সকল সবুজ মেরুন জনতার বুকে আলাদা জায়গা করে নেয় “স্টেন-গান ” সেলিব্রেশন।


২০১৭ র ফেডারেশন কাপ। স্টেন গান সেলিব্রেশন ততদিনে “ইস্টবেঙ্গলের ত্রাস” হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেমিফাইনালে মুখোমুখি দুই প্রধান। সবুজ মেরুন জার্সিতে সবচেয় গুরুতপূর্ণ ম্যাচটি নিজের অপ্রতিরোধ্য ফর্ম বজায় রেখে সতীর্থ বাল্লু এবং দারেল ডাফিকে দিয়ে গোল করালেন। সারা ম্যাচে সেন্টার লাইনের ওপর যেখানে বল সেখানেই তিনি আর তাকে মার্ক করতে লাল-হলুদ ডিফেন্ডারদের নাকানি-চোবানী অবস্থা। ম্যাচ শেষে কটকের বরবটি স্টেডিয়ামে সবুজ মেরুন উচ্ছাস। ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল তত্কালীন আই-লিগ চ্যাম্পিয়ন বেঙ্গালুরু এফসি। ১২০ মিনিট সমানে সমানে টক্কর চলার পর এক্সট্রা-টাইমে হার নেমে আসে। ফেডারেশন কাপে তার ধারাবাহিক পারফরম্যানস প্রশংসা কুড়িয়ে নেয় ভারতের সকল ফুটবলপ্রেমী, তথাপি প্রতিপক্ষ কোচদের থেকেও। কাপটা অধরা থাকলেও টুর্নামেন্টের শ্রেষ্ঠ প্লেয়ার তকমাটা পকেটে নিয়েই ফিরলেন।


২০১৭-১৮ মরশুমেও তিনি আবার সবুজ-মেরুনে থেকে যান। সেবছর যখন একে একে সবাই পাড়ি দিচ্ছেন আই এস এলের গ্ল্যামারে, মুম্বই সহ আরো কয়েকটি আই এস এল দলের লোভনীয় অফার ছেড়ে পুরনো ক্লাবে সবুজ মেরুনের প্রতি আনুগত্যে আই লীগ খেলার জন্য থেকে যাওয়াটা ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তবে প্রথম তিন বছর নিজের জাদু কাঠির ছোয়ায় মোহিত করে রাখলেও চতুর্থ মরশুমে নেমে এল অন্ধকার। ডার্বিতে চিরপ্রতিদ্ধন্ধীকে মাটি ধরালেন। পরের ম্যাচে আঘাত অনুভব করলেন হাঁটুতে। সেই আঘাত নিয়েই পুরো ম্যাচ ছুটলেন সোনি নর্ডি। বক্সের বাইরে থেকে তাঁর শটটা যখন চার্চিলের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে, তখনই আর পারলেন না তিনি। শুয়ে পড়লেন। ম্যাচের পর জানা গেল মেনিসকাস ইনজুরি। হাঁটুতে হয়তো অস্ত্রপচার করতে হতে পারে। পরপর চারটে ম্যাচ স্কোয়াডে না থাকার পর সমর্থকদের মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে। অবশেষে তিনি ঠিক করেন বাকি মরসুমের খেলতে না পারার খবর তিনি নিজেই সাংবাদিক সম্মেলন করে জানাবেন ক্লাব তাঁবু থেকে। জানুয়ারি মাসের এক থমথমে দুপুরের সাংবাদিক সম্মেলন দেখেছিল একজন বিদেশী প্লেয়ার কতটা অল্প সময়ের জন্য খেলে একটা ক্লাব আর সমর্থকদের আপন করে নিতে পারে। না, তিনি জন্মগত ঘটি ছিলেন না। না, তার বাড়ির তিন পুরুষ কেউ মোহনবাগানী ছিলেন না। কিন্তু এক নিবিড় টানের বন্ধন তাকে অঝোরে কাঁদিয়েছিল। তার অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে কোটি কোটি সমর্থকদের চোখেও নেমেছিল প্লাবন। সবুজ মেরুনের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, চতুর্থ বার লীগ জয়ের অন্যতম কান্ডারী এবং মোহন জনতার একান্ত আপন নয়নের মনি “সনি নর্ডি”| তিনি কথা দিলেন তিনি ফিরবেন। যেতে যেতে দেখে গেলেন নর্ডিহীন বাগানের পাল মোঘ্রাবি-ডিকারা সাবধানে সামলে রাখছেন। ২-০ ডার্বি জয়ে গ্যালারি অম্লান-বিষণ্ণ। হাজার হাজার ক্ষুদে সমর্থক সনির মুখোশ পরে তাদের স্বপ্নের নায়ককে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।এ দৃশ্য আগে কখনো ময়দান দেখছে? ডার্বিতে যে ফুটবলার ম্যাচ স্কোয়াডে নেই তার মুখোশ selling like hot cakes! 


বিদায়বেলায় কাতারে কাতারে মানুষ এসেছিলেন দমদম বিমানবন্দরে। কে জানে এই হয়ত তাদের প্রিয় নায়েকর সঙ্গে শেষ দেখা। এ ভিড় দেখে বোঝার উপায় ছিলনা, সেটা কোন ট্রফি জয়ের আনন্দের ভিড় নাকি কোন এক প্লেয়ারকে বিদায় জানানোর শোকের ভিড়। 

সনি কথা রাখলেন। আবার ফিরলেন নতুন মরশুমের আগে। এবারে সম্পূর্ণ নতুন রূপে l এবার বাগান অধিনায়ক। তার কাছে ১৬ নম্বর জার্সি নেওয়ার সুবিধা ছিল কিন্তু নিলেন তিনি ৫০ নম্বর জার্সি। চোট থেকে ফেরার পর প্রথম কয়েকটা ম্যাচে তিনি নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি, প্রশ্ন উঠে যায় তার দায়বদ্ধতা নিয়ে। রাবণের লঙ্কা থেকে ফেরার পর সীতা মায়ের অগ্নিপরীক্ষা নিয়েছিলেন ভগবান রাম। আর এটা তো ভারতের জাতীয় ক্লাব। ঘরের মাঠে আইজলের সাথে কোন রকমে ধুঁকছে মোহন বাগান। ম্যাচের বয়স ৭৫ মিনিট। সাবস্টিটিউট বোর্ডে সবুজ আলোয় জ্বল জ্বল করে উঠল ‘৫০’ নম্বরটা। গ্যালারির জয়ধ্বনির মাঝে শত যুদ্ধের কান্ডারী নামলেন তাঁর ‘ওয়ান লাস্ট ড্যান্স’-এ। নিজের হাত থেকে খুলে ক্যাপ্টেনস্ আর্মব্যান্ড ম্যাজিশিয়ানের হাতে পরিয়ে দিলেন কিংসলে। “ওয়েলকামব্যাক ম্যাজিশিয়ান, দ্য স্টেজ ইস অল ইয়োরস্!” পরের পনের মিনিটে ম্যাজিশিয়ানও বুঝিয়ে দিলেন কেন তিনি মোহনজনতার এতটা কাছের, এতটা আবেগের। সূক্ষ্ম ড্রিবল আর তীক্ষ্ণ পাসিং ফুটবলে অপনেন্ট প্লেয়ারদের সাথে সাথে প্রেসের কুখ্যাত কিছু তকমা- ‘নর্ডি সমর্থকদের আবেগ নিয়ে খেলতে শিখে গেছে’ ইত্যাদি কে হেলায় ছিটকে ফেলে দিলেন। বাঁ প্রান্তে বল পেয়ে গতি বাড়ালেন, ইনসাইড চ্যানেল দিয়ে দৌড়োলেন, স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় আইজলের দুজনকে পায়ের কাজে ছিটকে ফেললেন। তৃতীয় জনকে আউটসাইড ডজ করলেন বটে কিন্ত ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছেন অনেকটা গোললাইনের দিকে। দুরূহ কোণ। ঠিক কী ভাবছিলাম তখন জানা নেই। আসলে মনে নেই। এটুকু মনে আছে সোনি নর্ডি কোনো কাট ব্যাক করেন নি! একটা জোরালো শট, ওই দুরূহ কোণ থেকেই। কেঁপে গেল জাল। এগিয়ে গেল মোহনবাগান। চোখের কোণ ততক্ষণে চিকচিক করছে! এই শেষ বসন্তের বাগানে তিনি এখনও একমেবাদ্বিতীয়ম নায়ক। তিনি সোনি নর্ডি।

যে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা একদিন মোহন জনতাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল লীগ শিরোপা ঘরে তোলার এবং পরবর্তীকালে সেই স্বপ্নকে সত্যি করে তোলে, সোনালী চুলের সেই জাদুকর মোহন জনতাকে তাঁর খেলার মাধ্যমে সম্মোহিত করে রেখেছিল। তাঁর খেলার মধ্যে ছিল আলাদা এক ভঙ্গিমা , আলাদা এক আনন্দ, মাঠে যেন শুধু দলের জয়ের জন্য নয়, দর্শকদের মন জয়ের জন্যও নামতেন তিনি। তার হাত ধরেই গঙ্গা পাড়ের তাঁবুতে আসে আই লিগ লীগ, ফেডারেশন কাপ। এ যেন এলাম, দেখলাম, জয় করলাম। তাঁরই জমানায় প্রথম ভারতীয়  ক্লাব হিসেবে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ এর ম্যাচ জেতে মোহন বাগান, নেপথ্যে তার জাদু। মাঠে নামলে তার খেলায় সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন তিনি, বিপক্ষকে ঘরের মাঠে হোক বা তাদের মাঠে- তাদেরকে হারানো মুড়ি-মুড়কি বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ইগর, ব্যারেটোর পরে মোহন বাগানে খুব কম বিদেশী খেলোয়াড় এসেছেন যারা আপামর মোহন জনতার হৃদয়ে থেকে গেছেন এবং থেকে যাবেন, আর সেই তালিকাতে সবথেকে ওপরে যে নামটা থাকবে সেটা নিঃসন্দেহে সনি নর্ডির। 


২০১৮-১৯ মরশুমের পর বাগান কর্মকর্তারা নতুনভাবে দল সাজানোর পরিকল্পনা করে পঞ্চমবার ঘরে তোলার লক্ষ্যে, ফলে সনি নিজের অজান্তেই সবুজ-মেরুন জার্সিতে খেলে ফেলেন তার শেষ ম্যাচ, তিনি পেলেন না তার নায়ক সুলভ বিদায়। মোহনবাগানের হয়ে শেষ ম্যাচেও গোল পেয়েছিলেন তিনি।শিলং লাজঙের বিরুদ্ধে ফ্রিকিকটা জালে যখন জড়ালেন, তখনও বোধহয় আমরা কেউ ভাবিনি যে ম্যাজিশিয়ান আর কোনোদিন সবুজ মেরুনের হয়ে মাঠে নামবেননা। ব্যারেটোর শেষ ম্যাচের মত তাঁর জন্য ঝাঁক ঝাঁক বেলুন উড়িয়ে নিয়ে যায়নি কোনো "সেলাম সোনি" লেখা প্ল্যাকার্ড। যে জার্সি পরে, যে ক্লাবের হয়ে তিনি এতদিন খেলে অসংখ্য স্মৃতি রেখে গেছেন, সেই ক্লাবের থেকে আরেকটু অন্যরকমভাবে বিদায় হয়তো তিনি নিজেও আশা করেছিলেন।

আসলে তিনি তো "ম্যাজিশিয়ান"। সকলকে আনন্দ দেওয়ার পরেও যেমন হল ফাঁকা করে দর্শকরা বিদায় নেয়, দিনের শেষটা শূণ্য মঞ্চে একাকী হয় ম্যাজিশিয়ানদের, ঠিক তেমনি মোহনবাগানকে অন্ধকার থেকে আলোয় এনে অনাড়ম্বরভাবে তাঁর মোহন অধ্যায় শেষ করলেন ম্যাজিশিয়ান।

বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে "ব্রেস", ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে ফ্রিকিক, সালগাওকরের বিরুদ্ধে বারাসতে বিশ্বমানের গোল, আইজলের বিপক্ষে কামব্যাক, একত্রিশে মে, নয়ই এপ্রিল- এগুলো তো আভিজাত্য। আর একের পর এক ডিফেন্ডারকে ড্রিবলে ছিটকে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া, ঠিকানা লেখা ক্রস গুলোতে ঠিক জেজে বলবন্ত গ্লেন কাতসুমি ডাফিদের মাথা খুঁজে নেওয়া, বিপক্ষের অর্ধে ত্রাসের সৃষ্টি করা, উইথ দ্য বল দুর্বার গতি- এগুলো যেন ছিল বিশুদ্ধ রোমান্স। তিনটি মরশুম, একটা আধা ফিট মরশুম আর এক মরশুমে সাকুল্যে তিনখানা ম্যাচ- এই সময়ে তিনি যা দিয়েছেন, তাতে আমাদের ঘরের ছেলে হয়ে উঠেছেন সোনালী চুলের জাদুকর। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় গেয়েছেন, "জালে বল জড়ালি কোন মায়াজালে...", জালে যেমন সোনি বল জড়িয়েছেন, ঠিক তেমনই আমাদেরও একটা অদ্ভুত মায়াজালে জড়িয়ে ফেলেছিলেন তিনি। একটা যুবভারতী, একটা শিলিগুড়ি, একটা বারাসাত, একটা কান্তিরাভা তাঁর জাদুমঞ্চ। আস্ত একটা সময়ের স্টপওয়াচ যেন তাঁর হাতে।


এরপর জিরা এফসি, মেলাকা হয়ে তেরেঙ্গানুতে এসেছেন তিনি। টুকটাক ভিডিও, যেগুলো তিনি শেয়ার করেন অথবা তাঁর পরবর্তী ক্লাবগুলো থেকে প্রকাশ করা হয়, সেগুলো দেখলে বোঝা যায় যে গতি হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্ত এখনো সোনি নর্ডি আছেন সোনি নর্ডিতেই। সব ডিফেন্ডারদের বাধা কাটিয়ে গোল করছেন, অসাধারণ ফ্রীকিক নিচ্ছেন, নয়নাভিরাম থ্রু বাড়াচ্ছেন। এগুলো দেখলে মনে হয় আর যদি একবার তাঁকে দেখতে পেতাম আমাদের সবুজ মেরুন জার্সিতে! কিছুদিন আগে আই এস এলে জামসেদপুর এফসি ম্যাচে গোল করে স্টেন গান সেলিব্রেশন করে গ্যালারির দিকে ছুটে গেলেন মোহন জনতার নতুন হার্টথ্রব দিমিত্রি পেট্রাটোস। পরে জানালেন, এটা ক্লাব লেজেন্ড সোনি নর্ডির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্য। যে ডার্বি প্রথম দেখেছিল স্টেন গান, সেই ডার্বিতে স্মৃতি উস্কে দিয়ে জেসন কামিঙ্গস্ করলেন একইভাবে উদযাপন। জুনিয়র ডার্বিতে সুহেল, টাইসনরা ট্রিবিউট দিলেন একইভাবে। 


চলতে থাকুক স্টেন গান, চলতে থাকুক ম্যাজিশিয়ানকে নিয়ে রোমান্টিসিজম, আমাদের স্মৃতিতে ম্যাজিশিয়ানের ম্যাজিকে বেসামাল হয়ে পড়ুক ইস্টবেঙ্গল থেকে বেঙ্গালুরু, সাউথ চায়না থেকে তেম্পাইন রোভার্স। আসলে সোনি নর্ডির হাঁটুর চোটের থেকেও অনেক বেশী চোট মোহন জনতার হৃদয়ে এসে লেগেছিল তাঁর বিদায়ে। সময় এগিয়ে চলেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চলতেও অসংখ্য মোহনবাগানী কোথাও যেন এখনও সুমনের মতই বিশ্বাস করেন, "...তুমি আসবেই আমি জানি।"

সোনি নর্দে, তোমারে সেলাম! সেলাম।


Follow MBFT on TwitterFacebookInstagramYoutube, TelegramWhatsapp & Google News to stay updated with all the Mohun Bagan & Indian Football related News & Updates. Jai Hind Jai Bharat! Joy Mohun Bagan!

Previous Post Next Post