ম্যাচের বাঁশি তখন ৯২ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে, সময়টা হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো সেদিন যুবভারতীতে! অমরিন্দর সিং-এর গোল লক্ষ্য করে শট নিয়েছেন দিমি পেত্রাতোস, হঠাৎ একটা মুহূর্তের নিস্তব্ধতা
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৫;
মসৃণ শিল্ড যাত্রায় শেষ ল্যাপে হোসে মোলিনার মোহনবাগান! তিন ম্যাচ বাকি, দরকার মাত্র তিন পয়েন্ট। কিন্তু, তিন ম্যাচেই সামনে তিন যুযুধান প্রতিপক্ষ; ওড়িশা, মুম্বাই, গোয়া! আইএসএল ইতিহাসে মোহনবাগানের তিন সবচেয়ে বড়ো গাঁট। ওড়িশা ম্যাচ জিতেই শিল্ড নিশ্চিত করতে চাইছে মোহনবাগান। অপরদিকে, তৈরি সের্জিও লোবেরা'ও। মোহনবাগান কে কিছুতেই পার্টি করতে দেওয়া যাবে না আজ।
ম্যাচটার শুরুটাও হলো সেভাবেই, শুরু থেকেই বেশ নার্ভাস মোহনবাগান; বরং সুযোগ বুঝে বেশ কয়েকবার আক্রমণে উঠছিলো ওড়িশা। ম্যাচের ৭৫' অতিক্রান্ত, হট ফর্মে থাকা জেসন কামিংস কে আনার জন্য গ্যালারি থেকে চ্যান্ট উঠছে; ঠিক তখনই একটা কিস্তির চাল হোসে মোলিনার। সবাইকে অবাক করে মোলিনা মাঠে আনলেন দিমিত্রি পেত্রাতোস কে। দিমি পেত্রাতোস, বাগান জনতার মনের রাজা, মাঠের নতুন রাজা! কিন্তু, এই সিজনে দিমি? গত দুবছরে একটা আইএসএল কাপ, একটা শিল্ড, একটা ডুরান্ড জেতানো লোকটা এবছর হঠাৎ করেই হয়ে গেছেন বাগান জনতার কাছে সবচেয়ে বড়ো টার্গেট। যে দিমি আগের বছর অবধি গোলার মতো শটে বিপক্ষের জাল ছিঁড়ে দিতেন, সেই দিমির এই বছরটা খুবই নিষ্প্রভ গেছে; পুরো মরশুমে ওপেন প্লে থেকে গোল নেই!
তবে, সাধারণ মানুষের ভাবনা চিন্তার বাইরেও একটা জগত থাকে, ফুটবল দেবতার নিজের জগত; যেখানে মতি নন্দীর স্টপার গল্পের কমল গুহ থেকে বাস্তবের মোহন জনতার আদরের দিমি, সবার জন্যই তার একটা মুহূর্ত তৈরি করা থাকে, সব হারানোর পর, সব কিছু ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত!
ম্যাচের বাঁশি তখন ৯২ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে, সময়টা হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো সেদিন যুবভারতীতে! অমরিন্দর সিং-এর গোল লক্ষ্য করে শট নিয়েছেন দিমি পেত্রাতোস, হঠাৎ একটা মুহূর্তের নিস্তব্ধতা;
১০ই নভেম্বর, ১৯৯২;
সিডনি তে পেত্রাতোস পরিবারের ঘর আলো করে যেদিন দিমিত্রি জন্মেছিলেন, তার পরিবারের লোক কি ভেবেছিলেন এই ছেলে কেরিয়ারের শেষে মোহনবাগান জনতার মনের 'গড' হয়ে যাবে? গ্রীক ভাষায় দিমিত্রিয়স মানে ভগবান ডেমিটারের অনুগামী। ডেমিটার হলেন কৃষি, ফসল এবং উর্বরতার প্রাচীন গ্রীক দেবী। এই নামটি পৃথিবীর সাথে সংযোগ এবং দেবীর সাথে সম্পর্কিত লালন-পালনের দিকগুলিকে বোঝায়। এটিকে আসার পর মোহনবাগান যখন কোনো ট্রফি জিতছিলোনা, তখনই বাগানে আবির্ভাব দিমিত্রি'র। মোহনবাগানের শেষ তিন বছরের সাফল্যে সবচেয়ে বড়ো অনুঘটক দিমি'ই বোধহয় আমাদের সাজানো বাগানকে লালন পালন করে মোহনবাগান কে 'হোম অফ চ্যাম্পিয়ন্স' বানিয়েছেন।
২০০৯ এ পার্নিথ নিপিন ইউনাইটেডের হয়ে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সিনিয়র ফুটবলে অভিষেক করেন পেত্রাতোস। ২০১০এ তিনি যোগ দেন সিডনি এফসি'তে। এরপর একটা মরশুম মালয়েশিয়ার তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন কেলান্টান এফসি'তে। একটা মরশুম সেখানে কাটিয়ে আবার অস্ট্রেলিয়ায় ফেরেন দিমি, সই করেন ব্রিসবেন রোর ক্লাবে। ২০১৫য় এই ক্লাবে সই করেন আরেক মোহনবাগানী জেমি ম্যাকলারেন। ২০১৩-১৭, ৪ বছর ব্রিসবেনে থাকার পর দিমি পাড়ি জমান সাউথ কোরিয়ায়। Ulsan Hyundai এ যোগ দিলেও ৬মাস পরেই দিমি ফিরে আসেন অস্ট্রেলিয়া, সই করেন নিউক্যাসল জেটস'এ। সেই সময়েই তার পারফরমেন্সের জন্য তিনি জায়গা করে নেন অজি জাতীয় দলে, সুযোগ পান ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপেও। নিজের কেরিয়ারে বিভিন্ন ক্লাবে সফল ভাবে খেললেও তখনও যেনো নিজের ঘর খুঁজে পাননি পেত্রাতোস। ২০২০-২২ সৌদি লীগের আল ওহেদা'তে ছিলেন দিমি। এই সময়েই অন্য ক্লাব খোঁজা শুরু করেন পেত্রাতোস। অন্য দিকে মোহনবাগানে তখন হুয়ান ফেরান্দো কোচ, তার দলের জন্য বেশ হাই প্রোফাইল বিদেশী স্ট্রাইকারের খোঁজে নামে মোহনবাগান। একজন সার্বিয়ান স্ট্রাইকারের সাথে কথাবার্তা'ও এগোয় অনেকটাই; কিন্তু , হুয়ান চাইছিলেন এমন একজন কে, যে ট্র্যাডিশনাল নাম্বার নাইন হবেনা, বরং সে হবে ফলস নাইন; মাঝমাঠ এবং অ্যাটাকের মধ্যে সে যোগসূত্র হবে। তার সৌজন্যে বারবার গোলের সুযোগ পাবে হুগো, লিস্টন, মনবীর, কিয়ান রা। এই সময়েই মোহনবাগানের নজরে আসে পেত্রাতোসের প্রোফাইল। হুয়ান পান তার ফলস নাইন কে; ফুটবল দেবতা মোহনবাগানেই তার ঘর খুঁজে দেন দিমিত্রি কে। শুরুটা ভালো না হলেও সিজনের মাঝপথ থেকে ছন্দ পান দিমি, তার সৌজন্যে ছন্দে ফেরে হুয়ানের মোহনবাগান-ও। দিমি মাস্টারক্লাসে প্রথমবার আইএসএল কাপ আসে গঙ্গা পাড়ের ক্লাবে। সাথে ঘটে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বাগান সমর্থক দের দাবি মেনে নিয়ে ক্লাবের নাম থেকে সরে যায় এটিকে। একি সাথে একাধিক যুদ্ধজয়ের পর, পরবর্তী মরশুমে লক্ষ্য ছিলো অধারা শিল্ড ছুঁয়ে দেখা। তবে, মরশুমের শুরুতে ডুরান্ড কাপ ডার্বি হারায় যে অকথ্য আক্রমণের লক্ষ্য হয় মোহনবাগান, তার বদলাটা আগে নেওয়ার দরকার ছিলো! ডুরান্ড ফাইনালেই আরেকবার সুযোগ আসে। মোহনবাগান সমর্থকদের "এই মাঠেই বদলা নেবো" হুঙ্কার কে বাস্তবায়িত করার জেদ নিয়ে সেদিন মাঠে নেমেছিলো মোহনবাগান। ১০ জনে হয়ে যাওয়া বাগান দলে সেদিন নিজের ২০০% উজাড় করে দিয়েছিলেন পেত্রাতোস। মাঝমাঠ থেকে একটা দৌড়, বক্সের বাইরে থেকে একটা শট, গোলকিপার প্রভসুখন গিল'কে পরাস্ত করে যখন গোলে ঢুকে যাচ্ছে, তখন মোহনবাগানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে লেখা হচ্ছে একটা নতুন অধ্যায়; 'দ্য বার্থ অফ আ লেজেন্ড: দিমিগড'
তবে দিমিত্রির দিমিগড হয়ে ওঠা তখন'ও বাকি। আইএসএল শিল্ড জয়ের লড়াইয়ে নেমেছে মোহনবাগান ; পাঞ্জাব ম্যাচ, গোল-অ্যাসিস্ট; চেন্নাই অ্যাওয়ে, গোল; গোয়া ম্যাচ হারলেও বিশ্বমানের ফ্রী কিক; ইষ্টবেঙ্গল ম্যাচে ২-১ পিছিয়ে থাকা মুহূর্তে ২-২ করা গোল; গোয়া অ্যাওয়ে তে বিশ্বমানের গোল করে বাগান কে শিল্ড রেসে ফেরানো; নর্থইস্ট ম্যাচে গোল; জামশেদপুর ম্যাচে আবার গোল, ফিরতি ডার্বিতে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ পারফরমেন্স; কেরালা অ্যাওয়ে তে অ্যাসিস্ট, চেন্নাই ম্যাচ হারলেও আবার গোল, মাস্ট উইন পাঞ্জাব অ্যাওয়ে তে তার করা একমাত্র গোলে বাগানের তিন পয়েন্ট; দিমিত্রি বারবার প্রমাণ করেছেন নিজেকে। তবে, সব অ্যাথলিটের কেরিয়ারে একটা মুহূর্ত আসে, নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত। ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪, শিল্ড পেতে জিততেই হবে মোহনবাগান কে। সেদিন হাবাসের তুরুপের তাস ছিলেন দিমিত্রি। মোহনবাগান দলের জেনারেল দিমিত্রির অবদান ছিলো সেদিনের ২টো গোলেই; ম্যাচে তার জোড়া অ্যাসিস্টে প্রথমবার আইএসএল শিল্ড আসে মোহনবাগানে, বাগান জনতার মনে প্রতিষ্ঠা পায় তাদের নতুন হার্ট থ্রব দিমিত্রি পেত্রাতোস!
এরপর, সময়টা ভালো কাটেনি দিমিত্রির, আইএসএল কাপে হার, তারপর ডুরান্ড ফাইনাল হাতছাড়া! ফ্যান বেসের একাংশের কাছে যেনো চক্ষুশূল হয়ে গেছিলেন দিমিত্রি। কু মানসিকতার সমর্থক থাকে সব দলেই, মোহনবাগান ও ব্যতিক্রম না। এহেন পরিস্থিতিতে তার দিমিগড নামকে বিক্রিত করে বা দিমিত্রি সমর্থকদের'ও হেয় করতে ছাড়েন নি তারা। ফুটবল দেবতা সবকিছুই দেখেছিলেন।
২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৫;
ম্যাচের বাঁশি তখন ৯২ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে, সময়টা হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো সেদিন যুবভারতীতে! অমরিন্দর সিং-এর গোল লক্ষ্য করে শট নিয়েছেন দিমি পেত্রাতোস, মুহূর্তের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে বলটা গোলে জড়িয়ে যাচ্ছে! রবিবার রাত্রি ৯.৩০ টায় একটা ফিনিক্স পাখির পুনর্জন্ম দেখছে গোটা ৬০,০০০ লোক, টিভি, ওয়েবের পর্দায় সংখ্যাটা বোধহয় কয়েক কোটি। মাঠ থেকে বুকের মোহনবাগান ব্যাজ চাপড়ে দৌড়ে গ্যালারির ফেন্সিং টপকে সমর্থক দের সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন সিডনির একজন। সেই দিমি, যিনি অনায়াসে মিশে যান কাদাপাড়ার কচি কাঁচা দের সাথে, সেই দিমি, যিনি মোহনবাগান জনতার হৃদয়সম্রাট সোনি নর্দে কে ট্রিবিউট দিয়ে করেন স্টেনগান সেলিব্রেশন , সেইদিমি, যিনি নিজের খারাপ দিনেও আত্মবিশ্বাস রাখেন ফিরে আসার, সেই দিমি, যিনি যেকোনো ডার্বি ম্যাচে একজন বাঙালির মতো নিজের সবটা উজাড় করে দেন, সেই দিমি, যিনি অনায়াসে বলতে পারেন, ব্ল্যাঙ্ক চেকের অফার এলেও তিনি মোহনবাগানেই থেকে যাবেন; সেই দিমি, যিনি সিজন শুরুতেই বলতে পারেন, 'কামব্যাক? কামব্যাক ফর হোয়াট?', সেই দিমি মোহনবাগানের ইতিহাসে নিজের নামটা সোনার অক্ষরে লিখে ফেলেন ওড়িশার বিরুদ্ধে শিল্ড জেতানো গোল করে!
ফুটবল দেবতা ডুরান্ড ফাইনালে যে অধ্যায়টা লেখা চালু করেছিলেন, তার নামটা সেদিন বদলে রাখেন "দ্য বার্থ অফ অ্যান আনডিসপুটেড মোহনবাগান লেজেন্ড, দিমিত্রি পেত্রাতোস, এ কে এ, দিমিগড"
মার্চ, ২০২৬ঃ
এবছরে সের্জিও লোবেরার হাতে পড়ে বদলে গেছেন দিমি! গত সিজনের অফ ফর্ম নয়, বরং এই দিমি ২০২৩-২৪ এর মতোই ক্ষুধার্ত; এই দিমি আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। লোবেরার অধীনে দিমি পেয়েছেন তার পছন্দের জায়গা; স্ট্রাইকারের ঠিক পিছন থেকে খেলছেন পেত্রাতোস; হঠাৎই চকিতে শট রাখছেন গোলে, আবার কখনো বক্সের মধ্যে মাপা পাসে খুঁজে নিচ্ছেন সতীর্থদের! মাত্র ৪ ম্যাচেই ২টি গোল, ১টি অ্যাসিস্ট, ১টি প্রি অ্যাসিস্ট করে ফেলেছেন দিমি পেত্রাতোস। আগামী শনিবারে বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে মোহনবাগান জার্সি গায়ে শততম বারের জন্য মাঠে নামবেন বাগান জনতার হার্টথ্রব!
নিজের ১০০তম ম্যাচ কি স্মরণীয় করে রাখতে পারবেন দিমিত্রি পেত্রাতোস? বাগান জনতার চোখ থাকবে সেদিকেই।
এক নজরে ৯৯* দিমি!
দেখুন দিমির মোহনবাগান অধ্যায়, এক ঝলকেঃ
