২৯শে জুলাই, এবং, মোহনবাগান

লিখলেন সৌরভ মল্লিক

সালটা ১৯১১, দিন ২৯ শে জুলাই, আই এফ এ শিল্ড ফাইনাল, মোহনবাগান বনাম ইস্ট ইয়র্কস্যার। প্রথমার্ধের খেলা শেষ, জ্যাকসনের করা গোলে ১-০ গোলে এগিয়ে ব্রিটিশ দলটি। সারা ভারত জুড়ে যেনো একটা থমথমে ভাব, যেনো অকাল স্মসানে পরিণত হয়েছে দেশটা। সেমিফাইনালে সেন্ট জেভি়ার্স কে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে সবার প্রাণের প্রিয় মোহনবাগান। ১৮৯৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্ট টিতে আধিপত্য ছিল ব্রিটিশ আর্মি দলের,কিন্তু কোনো বাঙ্গালি তথা ভারতীয় দল কোনো ভাবেই প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ফাইনালে ওঠার পর থেকেই ব্রিটিশ অধীন ভারতীয় দের মনে আশা জাগাতে শুরু করে এই সবুজ মেরুন । তাহলে সব আশা কি এখানেই শেষ? ভারতীয়রা কি সবেতেই অক্ষম? আমরা কি চিরকাল ওদের হাতেই বন্দী থেকে যাবো? পারবো না কি ওদের এই অত্যাচারের একটা মোক্ষম জবাব দিতে?


ভারতবর্ষের তৎকালীন পরিস্থিতিটা একটু দেখে নেওয়া যাক। ব্রিটিশ অধীন ভারত তখন এক চরম উশৃঙ্খল পরিস্থিতির শিকার। একদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতের মূলধন শোষণ, অন্যদিকে ইংরেজ দের হাতে নিপীড়িত না খেতে পাওয়া ভারতবাসী। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়( যদিও ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় এবং ১৯৪৭ সালে পুনরায় বঙ্গ ভাগ হয়)। কোটি কোটি ভারতবাসীর তখন একটাই স্বপ্ন - স্বাধীন ভারত। দিকে দিকে জাতীয়তাবাদের আগুন, বিদ্রোহী কবিদের লেখা কবিতা, শত শত বীর ভারতীয় দের অকাল শহীদ। কিন্তু সকল চেষ্টাই বিফল এই গোড়া ব্রিটিশ দের অত্যাচারী হাতে। 


এই হেনো পরিস্থিতিতে শিল্ড ফাইনালে ওঠে সবার প্রানপ্রিয় মোহনবাগান। দিকে দিকে যেনো এক হঠাৎ বসন্ত, এই বুঝি ব্রিটিশদের অহংকার খর্ব হবে, ধ্বংস হবে তাদের ওই অগ্নিরূপি হিংসার লেলিহান শিখা। যদিও এই আই এফ এ শিল্ড এর ১১ জন মোহনবাগান খেলোয়াড় দের কম অত্যাচার সহ্য করতে হয়েনি এই টুর্নামেন্ট খেলার জন্য। তাদের বাড়ি ঢুকে লুটপাট থেকে শুরু করে প্রিয়জনের প্রাণ নাশ কোনোটাই বাদ দেয়েনি ইংরেজরা। এই সকল ঘটনা যেনো হঠাৎ এক জেদে পরিণত হয় তাদের কাছে, যে, তাদের জিততেই হবে, ভেঙে দিতে হবে ওই বিদেশি দের সকল দম্ভ। শুধু খেলোয়াড় রাই নয় , সমগ্র ভারতবাসীর মনে গেঁথে যায় এই জেদ। আর তার সাথে দর বাড়তে থাকে এই ফাইনাল খেলাটির। কবি থেকে শুরু করে সকল জাতীয়তাবাদীদের মনে উঠেছিল এক অদ্ভুত আবেগের জোয়ার। 
কিন্তু প্রথমার্ধে তো পিছিয়ে ভারতীয়রা, জ্যাকসন এর পা থেকে বলটা গোলে জড়াতেই চারিদিক নিস্তব্ধ। সবার মনেই একটাই প্রশ্ন, "পারবনা কি আমরা এবারেও তাহলে?"


শুরু হলো দ্বিতীয়ার্ধের খেলা। ব্রিটিশ দলটি প্রথম থেকেই রক্ষণার্থক ফুটবল খেলতে শুরু করে যাতে তাদের এই ১ গোলের ব্যবধান ভারতীয়রা শোধ না করে দিতে পারে। কিন্তু এটা যে বাঙালি, ফুটবল এদের রক্তে, পিছিয়ে থাকা এদের স্বভাব নয় । শিবদাস ভাদুড়ির করা গোলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সমতা ফেরায় মোহনবাগান। সারা মাঠ জুড়ে ঢাক, বাদ্যি বাজছে, ভারতীয় দের মনে এক হঠাৎ উন্মাদনা, মোহনবাগান সমতা ফিরিয়েছে যে!!!
এরপর শুরু হলো গোড়াদের নোংরা বিশৃঙ্খল খেলা। ফুটবল মাঠকে তারা পরিণত করলো কুস্তির আখরায়। দর্শকদের মনে জন্ম নিলো আশঙ্কার। এভাবে খেললে জিতব কীকরে? এভাবে মারলে খেলা যায়!!


কিন্তু, আগেই যে বলেছি!!! জাত টা বাঙালি, ফুটবল এদের রক্তে। যে কোনো বাধাই এদের কাছে তুচ্ছ। অভিলাষ ঘোষের করা গোলে মোহনবাগান জয়লাভ করে । খেলার শেষে ফলাফল দাঁড়ায় ২-১।


সারা দেশ মেতে ওঠে এক অকাল স্বাধীনতায় । কলকাতার ময়রারা ব্যস্ত হয়ে ওঠে মোহনভোগ নামক একটি মিষ্টান্ন প্রস্তুতিতে। কলকাতার সাহেব পাড়া স্তব্ধ হয়ে যায় , হোয়াইট আওয়ে বিপনী হয়ে যায় জনশূন্য। কলকাতার সমগ্র রাস্তা মিছিলে পূর্ণ হয়ে ওঠে। বাগবাজার, শোভাবাজার, শ্যামবাজার থেকে শুরু করে কলেজ স্ট্রিট , শেয়াল দহ লোকে লোকারণ্য । দিকে দিকে শোনা যেতে থাকে "ব্রিটিশ হাটাও, ভারত বাঁচাও" জাতিয়তাবাদী স্লোগান। কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশ রাও এতে নির্বিকার থাকতে বাধ্য হয়। 


অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। ইতিহাসবিদ দের মতে , ১৯১১ র শিল্ড জয় ভারতীয় দের নতুন ভাবে স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। মোহনবাগান যেন শুধু একটা ক্লাব নয়, ভারতীয় দের কাছে যেনো একটি আবেগ। লেখক যামিনী রায়ের কথায় - " জীবনের রং যেনো আজি সবুজ মেরুন"।


তারপর কেটে গেলো আরো অনেক বছর, গঙ্গার ওপর দিয়ে বয়ে গেলো কত জল। কিন্তু মোহনবাগান থেকে গেলো চিরনতুন, চিরসবুজ, চিরন্তন। 
জয় মোহনবাগান 💚♥  


শুভ মোহনবাগান দিবসের শুভেচ্ছা 💚❤️
অমর একাদশ - 
১. হিরালাল মুখার্জি ( গোল রক্ষক)
২. ভূতি সুকুল
৩. সুধীর চ্যাটার্জী
৪. মনমোহন মুখার্জি
৫. রাজেন সেনগুপ্ত
৬. নীলমাধব ভট্টাচার্য
৭. কানু রায়
৮. হাবুল সরকার
৯. অভিলাষ ঘোষ
১০. বিজয়দাস ভাদুড়ী
১১. শিবদাস ভাদুড়ী ( অধিনায়ক )




Previous Post Next Post